রেকর্ড উচ্চতার পর কেন কমছে সোনার দাম? জেনে নিন ৫টি মূল কারণ
গত বছর এবং ২০২৬ সালের শুরুর দিকে বিশ্ববাজারে সোনার দাম সব রেকর্ড ভেঙে সর্বকালের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই জোয়ারে বড় ধরনের ভাটা দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ডের দাম আউন্স প্রতি ৫,৫০০ ডলারের ঐতিহাসিক শিখর ছোঁয়ার পর বড় ধরনের সংশোধনের (Correction) মুখে পড়েছে এবং দাম প্রায় ২৮% পর্যন্ত কমে ৪,০০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সাপোর্ট জোনের কাছাকাছি নেমে এসেছিল।
আমার আগের আর্টিকেলে আমি আলোচনা করেছিলাম স্বর্ণের দাম কেন দিন দিন বাড়ছে? সেই বিষয়ে। কিন্তু ফরেক্স এবং কমোডিটি ট্রেডার হিসেবে এখন আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—হঠাৎ কেন সোনার বাজারে এই টানা পতন এসেছিল? চলুন বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এর প্রধান কারণগুলো জেনে নেওয়া যাক।
১. ইউএস ডলার ইনডেক্স (DXY) এবং বন্ড ইয়েল্ডের শক্তিশালী উত্থান
ফরেক্স মার্কেটের একটি সাধারণ নিয়ম হলো, মার্কিন ডলারের সাথে সোনার দামের বিপরীতমুখী সম্পর্ক (Inverse Relationship) থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ডলার ইনডেক্স (DXY) শক্তিশালী হয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সোনা কেনা বেশ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। একই সাথে ইউএস ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ড বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সোনা বিক্রি করে বন্ডের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন। যেহেতু সোনা থেকে কোনো নিয়মিত লভ্যাংশ বা সুদ পাওয়া যায় না, তাই উচ্চ সুদের বাজারে বন্ডের আকর্ষণ সবসময়ই বেশি থাকে।
২. ফেডারেল রিজার্ভের ‘হায়ার ফর লঙ্গার’ সুদের হার নীতি
চলতি বছরের শুরুতে ধারণা করা হচ্ছিল যে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (Fed) দ্রুত সুদের হার কমাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী শ্রমবাজার এবং কিছুটা বজায় থাকা মূল্যস্ফীতির কারণে ফেড সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসে এবং দীর্ঘ সময় সুদের হার উচ্চ রাখার (Higher for Longer) ইঙ্গিত দেয়। এই কড়া মুদ্রানীতি অ-লভ্যাংশকারী সম্পদ সোনার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক চাপ তৈরি করে।
৩. বড় বিনিয়োগকারীদের প্রফিট টেকিং
যেকোনো আর্থিক বাজারে কোনো অ্যাসেট অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি (Overextended Rally) পেলে সেখানে কারেকশন হওয়া স্বাভাবিক। সোনা গত দেড় বছরে প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি রিটার্ন দেওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক ইনভেস্টর ও হেজ ফান্ডগুলো তাদের মুনাফা সুরক্ষিত করতে ব্যাপক হারে সোনা বিক্রি শুরু করে। এই আকস্মিক বিক্রির চাপেই বাজারে লিকুইডিটি বেড়ে যায় এবং দাম দ্রুত কমতে থাকে।
৪. ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হওয়া
সোনাকে বলা হয় নিরাপদ আশ্রয় বা ‘সেফ হ্যাভেন’ (Safe Haven) সম্পদ। যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংকট বা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময় মানুষ সোনা কিনে রাখে। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বৈশ্বিক উত্তেজনা কিছুটা কমায় বিনিয়োগকারীদের মাঝে “রিস্ক-অন” (Risk-on) মেজাজ ফিরে আসে। মানুষ তখন নিরাপদ সম্পদ ছেড়ে শেয়ার বাজার বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা শুরু করে।
৫. কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার গতি কমে যাওয়া
বিগত বছরগুলোতে বিশ্ববাজারে সোনার দাম আকাশচুম্বী হওয়ার পেছনে অন্যতম মূল চালিকাশক্তি ছিল বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের—বিশেষ করে চীন ও ভারতের—রেকর্ড পরিমাণ সোনা মজুত করার প্রবণতা। তবে সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক তথ্য অনুযায়ী, সোনার দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এই আগ্রাসী কেনাকাটার গতি অনেকটাই ধীর হয়ে আসে, যা সরাসরি সোনার চাহিদাকে প্রভাবিত করেছে।
বাংলাদেশের বাজারে এর প্রভাব
আন্তর্জাতিক বাজারের এই পতনের ঢেউ আমাদের দেশের বাজারেও লেগেছিল। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (BAJUS) বিশ্ববাজারের সাথে সমন্বয় করে স্থানীয় বাজারেও সোনার দাম কয়েক দফায় কমিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে যেখানে ২২ ক্যারেট সোনার ভরি রেকর্ড ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় উঠেছিল, তা ধাপে ধাপে কমে সাধারণ ক্রেতাদের কিছুটা নাগালের মধ্যে চলে আসে।
সাম্প্রতিক FOMC মিটিং এবং সোনার বাজারে নতুন মোড়
গত ২৮-২৯ জুলাই অনুষ্ঠিত হওয়া মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের FOMC Meeting সোনার বাজারে নতুন এক মোড় এনে দিয়েছে। ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশ (Kevin Warsh) এবার সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা দেওয়ায় মার্কিন ডলার ইনডেক্স এবং ট্রেজারি বিলের ইয়েল্ড এক ধাক্কায় বেশ কিছুটা নিচে নেমে যায়। ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম দীর্ঘ দরপতনের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় ২% বৃদ্ধি পেয়ে আবার ৪,১০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক রেজিস্ট্যান্স জোন স্পর্শ করে।
আমার মতে, ফেডের এই নীতি বাজারে সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি করলেও সোনার জন্য এটি একটি শক্তিশালী বুলিশ ক্যাটালিস্ট (Bullish Catalyst) হিসেবে কাজ করছে।
সোনার দাম আবার কবে থেকে পুরোদমে বাড়তে পারে?
মার্কেট অ্যানালিস্ট এবং J.P. Morgan Global Research-এর সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষের দিকে এবং ২০২৭ সালের শুরুতে সোনার দাম আবার তার আগের অল-টাইম হাই (৫,৬০০+ ডলার) ভাঙার জন্য প্রস্তুত হতে পারে। এক্ষেত্রে মূলত দুটি বিষয় কাজ করবে বলে আমি মনে করি:
- সেপ্টেম্বর বা নভেম্বরের সম্ভাব্য রেট কাট: ফেড যদি আসন্ন সেপ্টেম্বর বা বছরের শেষ প্রান্তিকে সুদের হার কমানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়, তবে সোনা তার আসল বুল রান (Bull Run) শুরু করবে।
- ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার পুনরাবৃত্তি: মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে কোনো গোলযোগ বা অর্থনৈতিক মন্দার আভাস দেখা দিলে, নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার চাহিদা রাতারাতি আকাশচুম্বী হবে।
শেষ কথা: এটি কি দীর্ঘমেয়াদী মন্দা নাকি সাময়িক সুযোগ?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সোনার এই দরপতন কোনো স্থায়ী মন্দা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী বুল মার্কেটের স্বাভাবিক সংশোধন। J.P. Morgan এবং World Gold Council-এর মতো বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, ২০২৬ সালের শেষের দিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আবার বাড়লে সোনা তার আগের অবস্থান ফিরে পেতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে আবারও নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
দীর্ঘমেয়াদী ফরেক্স ও কমোডিটি ইনভেস্টর হিসেবে আমার পরামর্শ থাকবে, বর্তমানের এই $৪,০০০ ডলারের সাপোর্ট জোন এবং FOMC-পরবর্তী রিবাউন্ডের দিকে কড়া নজর রাখুন—এটি একটি চমৎকার বাইং অপরচুনিটি তৈরি করতে পারে।








